উলটকম্বল একটি বহুল পরিচিত ভেষজ গাছ যা ঔষধি গুণের জন্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গ্রামীণ পরিবেশে সহজেই জন্মানো এই গুল্মজাতীয় উদ্ভিদটি দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি এর প্রতিটি অংশে রয়েছে নানাবিধ চিকিৎসাগত উপকারিতা। এর ফুলের অনন্য রঙ, বীজের বিশেষ আকৃতি এবং ছালের আঁশযুক্ত গঠন একে অন্যান্য উদ্ভিদ থেকে আলাদা করেছে। শুধু মানুষের রোগ নিরাময়েই নয়, পশুপালনেও উলটকম্বলের ব্যবহার রয়েছে। সঠিক জমি নির্বাচন, পরিচর্যা ও সময়মতো সার প্রয়োগের মাধ্যমে কৃষকরা খুব সহজেই উলটকম্বল চাষ করে আর্থিক লাভের পাশাপাশি প্রাকৃতিক ভেষজের যোগান দিতে পারেন। এই ব্লগে আমরা উলটকম্বল চাষের সম্পূর্ণ পদ্ধতি, ঔষধি গুণাগুণ এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
উলটকম্বল গাছের পরিচিতি
ইংরেজি নাম: Devil’s Cotton
বৈজ্ঞানিক নাম: Abroma augusta
পরিবার: Sterculiaceae
উলটকম্বল একটি ঔষধি গুণসম্পন্ন গুল্ম বা ছোট আকারের বৃক্ষ, যা সাধারণত ৮ থেকে ১০ ফুটের বেশি উঁচু হয় না। এর ফুলের রঙ লাল ও কালোর মিশ্রণ, যা দেখতে আকর্ষণীয় হলেও এর বীজে রয়েছে চুলকানি সৃষ্টিকারী লোম। কাঁচা বীজ সবুজ এবং পাকলে ধূসর বা বাদামি রঙ ধারণ করে। বীজ কোষটি দেখতে উল্টানো বাটির মতো, যা থেকে গাছের নামের উৎপত্তি হয়েছে। গাছের ছাল আঁশযুক্ত, বাদামী বা মেটে রঙের এবং বিভিন্ন প্রকার ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ঔষধি ব্যবহার
উলটকম্বল গাছ শুধু শোভাময় নয়, বরং এর শিকড়, পাতা ও ছালে রয়েছে নানা রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা। প্রাচীনকাল থেকেই এটি ভেষজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। উল্লেখযোগ্য কিছু ঔষধি ব্যবহার হলোঃ
- বার্ধক্যজনিত রোগে: গাছের মূল শুকিয়ে গুঁড়ো করে তার সাথে গোলমরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে সেবন করলে বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যা উপশম হয়।
- বমনকালে বুক ধরফড়ানি: বমি বা বমিভাবের সাথে বুক ধরফড়ানি দেখা দিলে গাছের মূলের ছাল ব্যবহার কার্যকর।
- গনোরিয়া ও ফোঁড়ায়: মূলের রস গনোরিয়া রোগ ও ফোঁড়ার চিকিৎসায় বিশেষ উপকারী। এছাড়া ঋতুস্রাব বন্ধে ও বমনকালের যন্ত্রনা নিরাময়ে মূলের ছালের নির্যাস ব্যবহৃত হয়।
পশুপালনে ব্যবহার
গরুর পাতলা পায়খানা হলে পাতা অন্যান্য উপাদানের সাথে পিষে বড়ি তৈরি করে খাওয়ানো হয়।
চাষের জন্য জমি নির্বাচন
উলটকম্বল গাছ প্রায় সব ধরনের মাটিতেই জন্মাতে পারে, তবে বেলে-দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। এই ধরনের মাটিতে পানি নিস্কাশন ভালো হয় এবং শিকড় দ্রুত বিস্তার লাভ করে।
জমি প্রস্তুতি
- জমি ভালোভাবে চাষ দিয়ে আগাছামুক্ত করতে হবে।
- চারা রোপণের আগে বীজতলা বা গর্তের মাটির সাথে ৩:১ অনুপাতে জৈব সার মিশিয়ে নিতে হবে।
- মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে পচা গোবর বা কম্পোস্ট ব্যবহার সবচেয়ে ভালো।
বংশবৃদ্ধির পদ্ধতি
উলটকম্বল চাষে দুই ধরনের বংশবৃদ্ধি পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়:
- বীজ থেকে চারা উৎপাদন
- কাণ্ড ও শিকড়ের কাটিং দ্বারা রোপণ
বীজ বপন/চারা রোপণ
আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে বীজ সংগ্রহ করে কিছু দিন রোদে শুকিয়ে এক হতে দু’মাসের মধ্যে বীজ তলায় লাগাতে হয়। বীজ তলার জন্য মাটি, গোবর ও ভিজা কাঠের ভূষি (২ঃ১ঃ১) মেশানো হয়। বীজ লাগানোর পূর্বে দু’ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে নিলে বেশি পরিমাণ (৬৫%) বীজ অংকুরিত হয়।
চারা পরিচর্যা
- আগাছা দমন: জমি নিয়মিত আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
- ডালপালা ছাঁটাই: মরা ও শুকনো ডালপালা কেটে দিতে হবে।
- সেচ ব্যবস্থা: শুষ্ক মৌসুমে নিয়মিত সেচ দিতে হবে।
- সার প্রয়োগ: গাছে সার না দিলেও চলে। তবে প্রতি বছর ২০ কেজি জৈব সার দুই কিস্তিতে- ১ম কিস্তিতে মধ্য ফাল্গুন-মধ্য বৈশাখ (মার্চ-এপ্রিল) মাসে এবং দ্বিতীয় কিস্তিতে মধ্য আশ্বিন-মধ্য অগ্রহায়ন (অক্টোবর-নভেম্বর) মাসে প্রয়োগ করলে ভাল হয়। গাছের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে জৈব সারের পরিমাণ ১০% বৃদ্ধি করতে হবে।
ফুল ও ফল ধরার সময়
- ফুল আসা: জ্যৈষ্ঠ-ভাদ্র (মধ্য মে থেকে মধ্য সেপ্টেম্বর)
- ফল ধরা: শ্রাবণ-পৌষ (মধ্য জুলাই থেকে মধ্য জানুয়ারি)
অর্থনৈতিক গুরুত্ব
উলটকম্বল চাষ শুধুমাত্র ভেষজ চিকিৎসার জন্য নয়, বরং এটি কৃষকের জন্য একটি লাভজনক ফসল হতে পারে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ভেষজ বাজারে এই উদ্ভিদের চাহিদা রয়েছে। সঠিকভাবে চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করলে এটি একটি আয়ের উৎস হতে পারে।
রোগ ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা
যদিও উলটকম্বল গাছ তুলনামূলকভাবে রোগ প্রতিরোধী, তবুও কখনও কখনও পাতা ঝলসানো রোগ, শিকড় পচা এবং পাতা খেকো পোকার আক্রমণ দেখা দিতে পারে।
- আক্রান্ত ডালপালা কেটে ফেলুন।
- জৈব কীটনাশক যেমন নিম তেল স্প্রে করুন।
- পোকামাকড় দমনে FAO এর নির্দেশিকা অনুসরণ করতে পারেন।
উপসংহার
উলটকম্বল একটি বহুমুখী ঔষধি উদ্ভিদ যা সহজেই চাষ করা যায় এবং এর চিকিৎসাগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। সঠিক জমি নির্বাচন, বীজ প্রস্তুতি ও পরিচর্যার মাধ্যমে কৃষকরা স্বল্প খরচে ভালো ফলন পেতে পারেন। প্রাকৃতিক ও ভেষজ চিকিৎসায় এর ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগও রয়েছে।